সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ০৮:১৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ঘোষণা :

জয়পুরহাটের শিলপাটা শ্রমিকরা মৃত্যুঝুঁকিতে

জয়পুরহাট থেকে মোঃ জহুরুল ইসলাম ঃ –জয়পুরহাটের আক্কেলপুরের চক্রপাড়া গ্রামে স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন অর্ধশতাধিক শিল-নোড়া শ্রমিক।

মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে এরা শিল-নোড়া খোদাই করেজীবিকা নির্বাহ করছে। অন্যান্য দিন-মজুরির চেয়ে কম খাটুনিতে প্রায় সমপরিমাণ অর্থ উপার্জন হওয়ায় ঝুঁকি জেনেও তারা বাপ-দাদার আমলের এই পেশায় রয়েছে। জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলার চক্রপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় বাড়ির বাইরে একটু দূরে ঝোপ-ঝাড়ে ছোটো ও মাঝারি আকারের গুদাম ঘর রয়েছে।

প্রতিটি গুদাম ঘরের টিনের ছাউনী দেওয়া বারান্দায় বসে কিশোর, যুবক, বৃদ্ধসহ নানা বয়সী শ্রমিক ছেনি আর হাতুড়ি নিয়ে ঠুং ঠাং শব্দে পাথর কেটে তৈরি করে চলেছে মরিচ ও মশলা বাটার শিল-নোড়া, এই গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই দরিদ্র। অনেক আগে এখানে বেশ
কিছু শিল-নোড়া খোদাই শিল্পী ছিল, তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বাড়ির শিল-নোড়ায় ধার কেটে জীবিকা নির্বাহ করত। কয়েক জন মহাজন ৩০/৩৫ বছর আগে ভারত থেকে পাথর এনে কেটে শিল-নোড়া তৈরিসহ খোদাইয়ের কাজ শুরু করে। তারপর থেকে ধীরে ধীরে এই
ব্যবসা ওই গ্রামে প্রসার লাভ করে।

প্রতি সেট শিল-নোড়া (একটি পাটা ও একটি শীল) কাটলে শ্রমিকরা ৪০ থেকে ৪৫ টাকা মজুরি পায়। দিনে একজন শ্রমিক সর্বোচ্চ ১২
থেকে ১৪ সেট শিল-নোড়ার কাজ করতে পারে।

শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা স্বীকার করে মহাজনরা বলেন, ভারত থেকে ট্রেনে করে বগুড়ার সান্তাহারে পাথর আনা হয়। সেখান থেকে এখানে পাথর এনে শ্রমিকদের দিয়ে শিল-পাটা তৈরির পর চাহিদা অনুযায়ী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। মহাজনদের
ভাষ্য, এই গ্রামের মহাজনরা ব্যবসা বন্ধ করে দিলেও শ্রমিকরা দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে এই একই কাজ করবেন; কারণ একই পরিমাণ পারিশ্রমিকে অন্য পেশায় পরিশ্রম ও কষ্ট বেশী।

শ্রমিক মামুনুর রশিদ জানান, সাধারণ মজুরি খেটে বা শ্রমিকের কাজ করে দিনে সর্বোচ্চ রোজগার হয় ৩৫০ টাকা থেকে ৫শ টাকা। শিল-নোড়া তৈরি করেও একই পারিশ্রমিক পাওয়া যায়। তবে ঠান্ডা হাওয়া বা ছায়ায় বসে শিল-নোড়া তৈরির কাজ করে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়া যায় বলে এই গ্রামের গরিব মানুষরা এই পেশার প্রতি বেশ আকৃষ্ট।ঝুঁকিপূর্ণ এই কাজে শ্রমিকদের ধরে রাখতে মহাজনরা পারিশ্রমিকের অগ্রিম
টাকাও দিয়ে থাকেন।

সেদিক থেকে বলতে গেলে এটা এই কাজের কিছুটা বাড়তি সুবিধাও বটে। শিল-নোড়া শ্রমিক পলাশ বলেন, “এই কাম আরামের, শরীল ঘামে না, দেওয়ার (বৃষ্টি) পানিত ভিজাও লাগে না। কামলা দিয়ে যে ট্যাকা পাই, এটেও একই ট্যাকা পাই; তাই এই কাম করি। একদিন না এক দিন মরা তো লাগবেই, সেই ভয় করে কি লাভ আছে?”তবে এই পেশার শুরুর দিকে গ্রামে দুই শতাধিক শ্রমিক থাকলেও এখন কাজ
করছেন ৫০ থেকে ৬০ জন।

জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক সাইফুল ইসলাম বলেন, পাথরে খোদাই করার সময় নাক, মুখ ও লোমকূপ দিয়ে পাথরের কণা, ধুলা শরীরে প্রবেশ করে। ফলে শ্বাসযন্ত্র সংশ্লিষ্ট নানা রোগে তারা আক্রান্ত হয়। তাছাড়া পাথরের ধুলা শ্বাস-প্রশাসের সঙ্গে ফুসফুসে গিয়ে ফুসফুসের নানা জটিলাতার সৃষ্টি করে। এতে দিন দিন ফুসফুস দুর্বল হয়ে পড়ে। অল্প বয়সে মানুষ মৃত্যু-ঝুঁকিতে পড়ে। এবং অকালে মৃত্যুবরণ করে।

স্বাস্থ্য ও মৃত্যু ঝুঁকির কারণে শিল-নোড়া তৈরির বিকল্প ব্যবস্থা করে অবিলম্বে একাজ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এই ব্যাপারে আক্কেলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল হাসান বলেন, আগে চক্রপাড়া গ্রামে ব্যাপক ভাবে এইকাজ চলেছে। বর্তমানে কমে যাওয়ার কারণ হল অনেক শিল-নোড়া শ্রমিককে সামজিক বেষ্টনীর আওতায় এনে আর্থিকভাবে সহায়তা করা হচ্ছে। আবার কাউকে কাউকে
যোগ্যতা অনুযায়ী কর্ম দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করা হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষারও ব্যবস্থা করা হচ্ছে।



All Bangla Newspaper
ফেসবুকে আমরা

error: Content is protected !!