সোমবার, ১৪ জুন ২০২১, ০৯:৪২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ঘোষণা :

স্বাধীনতার ৫০ বছর: বাংলাদেশের আইসিসি সদস্যপদ লাভ এবং বঙ্গবন্ধু

১৯৭৭ সালের ২৬ জুলাই তারিখটি কি কারও মনে পড়ে ? এক কথায় উত্তর-মনে পড়ে না। দিন গড়ায়; বছর আসে, বছর যায়। নিভৃতেই পার হয়ে যায় ২৬ জুলাই। দিনটিকে মনে রাখার দায় অনুভব করে না কেউই। না ক্রিকেট বোর্ড, না ক্রিকেটসংশ্লিষ্টরা, এমনকি মিডিয়াও!

কিংবা কজনই বা জানে বঙ্গবন্ধুর সে কথাগুলো?

“অর্থমন্ত্রী তো তাজউদ্দীন (তাজউদ্দীন আহমেদ)। আমি যদি এ অবস্থায় ওকে কিছু বলি, তাহলে সে ভাবতে পারে, তার কাজে আমি হস্তক্ষেপ করছি। বরং তোরা যা। আমার বিশ্বাস তাজউদ্দিন সবকিছু বুঝবে।” ক্রিকেট সামগ্রীর উপর ১৩০ শতাংশ কর মওকুফের পরামর্শ এভাবেই দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু!

অথচ, এখন বিষয়টা এমন যে, বাংলাদেশ ক্রিকেট যেন টুপ করে আকাশ থেকে মাটিতে পড়েছে! বাংলাদেশ ক্রিকেটের যেন কোন অতীত নাই, ঐতিহ্য নাই, সর্বোপরি কোন ইতিহাসও নাই!

“১৯৯৭ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন হওয়া থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেটর জন্ম হয়নি। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাস–ঐতিহ্য অনেক সমৃদ্ধ। উপমহাদেশ ক্রিকেটের লিগ্যাসি বহন করছি আমরা। এ সত্যটিকে এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগই নাই”, কথাগুলো বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক রকিবুল হাসানের।

অতি তাৎপর্যপূর্ণ কথা। বাংলাদেশ ক্রিকেটের লড়াই–সংগ্রামের পথটা যে অনেক দীর্ঘ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সবাই স্ব স্ব কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ পেলেও নির্বিঘ্ন হয়নি বাংলাদেশ ক্রিকেটের পথচলা। পশ্চিম পাকিস্তানিদের জাতিগত বৈষম্যের শিকার হয়ে জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পাননি রকিবুল হাসান, আব্দুল হালিম চৌধুরী জুয়েলরা। পাকিস্তানি শোষণ-নিপীড়ণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে দেশের মানুষের আকাঙক্ষার সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠেন ক্রিকেটাররাও। ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। দেশ স্বাধীন হয়। নতুন দেশ। নতুন স্বপ্ন। সবাই যখন বড় স্বপ্নে বিভোর, তখন আদৌ খেলতে পারবে কি-না এই দুঃস্বপ্ন তাড়া করে ফিরছে ক্রিকেটারদের। অতঃপর নতুন করে আবারও রাজপথ, লড়াই-সংগ্রাম এবং ক্রিকেটারদের ব্যাট-বলের অধিকার ফিরে পাওয়া।

স্বাধীন দেশ। শুন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে সবকিছু। ভরসা বলতে স্বাধীন দেশের আবেগ। যাত্রা শুরু হল ক্রিকেটের। পুনর্গঠিত হল বোর্ড। ঘরোয়া ক্রিকেটের কার্যক্রম শুরু হল ১৯৭২ সালেই। কিন্তু ক্রিকেটের মত খরুচে খেলা চালু রাখাটা হয়ে পড়ল ভীষণ কঠিন। ১৯৭২ ও ১৯৭৩- এ দুই বছরই লীগ বন্ধ হয়ে গেল মাঝপথে। এরই মধ্যে বিনা মেঘে বজ্রপাত! ১৯৭৩ সালে টান পড়ল ক্রিকেটের অস্তিত্বেই। বন্ধ হওয়ার জোগাড় হল বাংলাদেশ ক্রিকেট।

ক্রিকেটের জন্য ব্যবহৃত সামগ্রীর উপর ১৩০ শতাংশ আর অন্যান্য ক্রীড়া সামগ্রীর উপর কর ধার্য করা হল ১০০ শতাংশ। ক্রিকেটের প্রতি এই বৈষম্যের কারণ, ক্রিকেট বনেদী খেলা। ক্রিকেট খেলা বিলাসিতা। সদ্য জন্মানো এই গরীব দেশে বিলাসিতার দরকার কি, এভাবেই বিবেচনা করা হল সবকিছু!

প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন ক্রিকেটাররা। প্রেসক্লাবের সামনে ব্যাট–বল পুড়ানো হল। ওই সময় ক্রিকেট বোর্ডের সেক্রেটারি ছিলেন মোজাফফর হোসেন পল্টু। ক্রিকেটারদের সঙ্গে দেখা করতে আসলেন বঙ্গবন্ধুর বড় সন্তান ক্রীড়া অন্তঃপ্রাণ শেখ কামাল। ক্রিকেট বাঁচাতে বঙ্গবন্ধুর কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।

প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও ক্রীড়া সংগঠক মোজাফফর হোসেন পল্টু।
এ সংকট থেকে পরিত্রাণ পাওয়া প্রসঙ্গে মোজাফফর হোসেন পল্টু বললেন, “ক্রিকেট বাঁচাতে তখন বঙ্গবন্ধুই আমাদের ভরসা। আমরা শেখ কামালকে অনুরোধ করলাম। কিন্তু সে জানালো, আমি না বলে প্রথমে আপনারা বললে ভাল হয়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি মন দিয়ে পুরো বিষয়টা শুনলেন। বললেন, অর্থমন্ত্রী তো তাজউদ্দীন (তাজউদ্দীন আহমেদ)। আমি যদি এ অবস্থায় ওকে কিছু বলি, তাহলে সে ভাবতে পারে, তার কাজে আমি হস্তক্ষেপ করছি। বরং তোরা যা। আমার বিশ্বাস তাজউদ্দিন সবকিছু বুঝবে।”

কিন্তু পল্টুদের মনে হলো অফিসে গিয়ে সরাসরি তাজউদ্দীন সাহেবকে বিষয়টা বলা যৌক্তিক হবে না। তাই অন্য একটা পরিকল্পনা আঁটলেন। ওই সময় মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারির দায়িত্বেও ছিলেন পল্টু। পুরো ঘটনা নিয়ে তার ভাষ্য, “আমরা মহানগরীর আওয়ামী লীগ আয়োজিত একটা প্রোগ্রামে তাজউদ্দিন সাহেবকে প্রধান অতিথি করে আনলাম। উনাকে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। যেদিন প্রোগ্রামের দাওয়াত দিতে গেলাম উনি বললেন, মতলবটা কী? ওই প্রোগ্রামে সব ক্রীড়া ফেডারেশনের উল্লেখযোগ্য কর্মকর্তাদের আনা হয়েছিল। যাই হোক, তাজউদ্দীন সাহেব প্রোগ্রামে আসলেন। সুযোগ বুঝে আমরা ক্রীড়া কর্মকর্তারা তাকে বিষয়টা জানালাম। আমাদের অনুরোধ তাজউদ্দীন সাহেব উপেক্ষা করেননি। ক্রিকেট সামগ্রীর উপর ৩০ শতাংশ কর রেখে বাকি ক্রীড়া সামগ্রীর উপর থেকে কর রহিত করলেন।”

এই ৩০ শতাংশ করও আবদার করে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে মওকুফ করিয়ে নিয়েছিলেন ক্রিকেটার-কর্মকর্তারা। কিভাবে পেরেছিলেন, সেটাও জানালেন মোজাফফর পল্টু, “আসলে তাজউদ্দিন সাহেব তো রাশভারী মানুষ। উনাকে তো আর সবকিছু বলা যায় না। তাই ক্রিকেট সামগ্রীর উপর থেকে এই কর মওকুফের জন্য আমরা আবারও বঙ্গবন্ধুর শরণাপন্ন হলাম। বঙ্গবন্ধু বললেন, চিন্তা করিস না, ক্রিকেট সামগ্রীর জন্য তোদের এডহক লাইসেন্স দিয়ে দেব।” এ অ্যাডহক লাইসেন্স ব্যবহার করে বিদেশ থেকে ক্রিকেট সরঞ্জামাদি আনা হত। আর এনএসসির মাধ্যমে জেলা শহরগুলোতে পাঠানো হত। মোজাফফরের ভাষায়, “আসলে, বঙ্গবন্ধু না থাকলে ক্রিকেটকে বাঁচানো যেত না।”

নতুন দেশে মাঠের খেলা চালিয়ে নেওয়ার জন্য ক্রীড়া সামগ্রী খুব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল বলে জানান দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিসিবির (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড) অন্যতম পরিচালক সাজ্জাদুল আলম ববি। বিসিবির এই পরিচালকের কথায়, “আমাদের ক্রীড়া সামগ্রীর কোন উৎস ছিল না। এর জন্য আমরা পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিলাম বিদেশের উপর। তাই মাঠের খেলা চালিয়ে নেওয়াটা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছিল। আর ক্রিকেট খেলা তো খুবই ব্যয়বহুল। ১৯৭৩ সালে লিগ শুরু হয়েও বন্ধ হয়ে গেল মাঝপথে। ওই সময়ের বাস্তবতা দিয়ে পরিস্থিতি ভাবতে হবে।”

সব বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে ১৯৭৪ সালে থেকে আবার ক্রিকেট স্বাভাবিকভাবে শুরু হয় এবং বাধাহীনভাবে চলতে থাকে। ১৯৭৪ সাল থেকে ক্রিকেট নিয়মিত মাঠে গড়ানোর ক্ষেত্রে ব্রিটিশ হাইকমিশনের যথেষ্টই ভুমিকা আছে বলেও জানান এই বিসিবি পরিচালক, “বাংলাদেশ ক্রিকেটের ওই দুর্দিনে অনেক সহায়তা করেছিল বৃটিশ হাইকমিশন। ক্রিকেট খেলার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক সরঞ্জামাদিই তারা সরবরাহ করেছিল।”

ক্রিকেটের মত একটা ব্যয়বহুল খেলা নিয়মিতভাবে আয়োজন করা কতটা কঠিন হতে পারে একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা পরিষ্কার করেন মোজাজফফর হোসেন পল্টু, “১৯৭৩ সালে তৎকালীন পূর্ব-জার্মানি থেকে বার্লিন ক্রীড়া সম্মেলনে যোগদানের জন্য একটা আমন্ত্রণপত্র এসেছিল। ২০ দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে ছিল এই সম্মেলন। বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য পাঠানো হয় আমাকে। ওই সম্মেলনে একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আয়োজকদের একজন বলল, আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছি ঠিক আছে। তবে তোমাদের দেশ থেকে কেউ এখানে আসতে পারবে এটা কিন্তু ভাবিনি। কারণ, একটা যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের শুরুতে যে কি অবস্থা হয়, এটা আমরা খুব ভালভাবে জানি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একটা রুটির জন্য আমাদের লাইন ধরতে হত। কমপক্ষে পাঁচ বছর এমন দুর্দশার মধ্য দিয়ে আমাদের কাটাতে হয়েছিল। সেখানে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই তোমরা খেলাধুলাও শুরু করে দিয়েছ। একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শুরু থেকেই আমরা সব খেলাধুলার সঙ্গে ক্রিকেটও শুরু করার সামর্থ দেখিয়েছি, এটা সন্দেহাতীতভাবেই খুব বড় একটা ব্যাপার।”

অস্তিত্ব সংকট থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৭৪ সাল থেকে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ ক্রিকেট। ঘরোয়া ক্রিকেট চালু রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ছাড়পত্র আদায়ের লড়াইও শুরু হয়। এক্ষেত্রে কয়েকটি নাম খুবই গুরুত্বপুর্ণ। ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক সাধারন সম্পাদক রইসউদ্দিন আহমেদ ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রথম কার্যনির্বাহী সম্পাদক রেজা-ই-করিম। এ দুজনই পাড়ি দিয়েছেন পরলোকে। দেশের ক্রিকেটকে নতুনভাবে সুসংগঠিত করে জাগিয়ে তুলতে অনন্য ভুমিকা রাখেন এই দুজন। ১৯৭৬-৭৭ মৌসুমে প্রথমবারের মত বাংলাদেশ সফরে আসে এমসিসি (মেরিলিবন ক্রিকেট ক্লাব)। এমসিসিকে দেশে আনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন এ দুই জন। বলা হয়ে থাকে, মোমবাতির আলোয় কাজ করে বাংলাদেশ ক্রিকেটের আলো জালিয়ে রাখেন দু জনে। বলা বাহুল্য ওই সময়ে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না ক্রিকেট বোর্ড অফিসে।

প্রথম বিদেশি দল হিসেবে ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ সফরে আসে এমসিসি। এটি শুধু একটি সফর ছিল না। এ সফরের মধ্যেই নিহিত ছিল দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যতও। ১৯৭৫-৭৬ ক্রিকেট মৌসুম শেষে বাংলাদেশকে আইসিসি সহযোগী সদস্যপদ দেয়ার আবেদন জানিয়ে এই মর্মে ওই সময়ের আইসিসি কার্যালয় লর্ডসে চিঠি প্রেরণ করেন রেজা-ই- করিম। ওই সময় বিসিবির (তৎকালীন বিসিসিবি) অ্যাকটিং সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করছিলেন রেজা। তার চিঠির জবাবে আইসিসি থেকে বলা হয়, “বাংলাদেশ ক্রিকেট সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণা নাই। তোমরা গঠনতন্ত্র পাঠাও। আর এমসিসিকে খেলার আমন্ত্রণ জানাও। তোমাদের ওখানে খেলার পর এমসিসি যে রিপোর্ট দেবে তার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।”

এরপর জাতীয় ক্রীড়া কাউন্সিলের অনুমোদন নিয়ে নিজে হাতে গঠনতন্ত্র তৈরি করে পাঠান রেজা-ই-করিম। সেইসঙ্গে বাংলাদেশ সফরের জন্য এমসিসিকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণও জানান। ১৯৭৬ সালের মে মাসে এমসিসিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। পরের মাসে অর্থাৎ ১৯৭৬ সালের জুনে লর্ডসে আইসসিসির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, এমসিসির সফরের পর বাংলাদেশের পারফরম্যান্স মুল্যায়ন সাপেক্ষে পরবর্তী বৈঠকে বাংলাদেশের সদস্যপদ বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

১৯৭৬ সালের অক্টোবর মাসে পুনর্গঠিত হয় বোর্ড (ওই সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড) । সভাপতির দায়িত্বে আসেন এস এস হুদা। সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পান রাইসউদ্দিন। আর যুগ্ম সম্পাদক হিসাবে নিয়োগ পান রেজা-ই-করিম। এমসিসি দল ঢাকায় অবতরণ করে ১৯৭৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ছাড়পত্রের নতুন পরীক্ষার সামনে তখন স্বাগতিক বাংলাদেশ। ওই সফরে তিনটি দুই দিনের ও একটি তিন দিনের ম্যাচ খেলে এমসিসি। প্রথম ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় রাজশাহী স্টেডিয়ামে। প্রথম ম্যাচে নর্থ জোনের মুখোমুখি হয় এমসিসি। ২৯ ডিসেম্বর বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে দুদলের ক্রিকটোরদের আনা হয় রাজশাহীতে। ৩১ ডিসেম্বর নবযাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশ ক্রিকেটের। এমসিসি অধিনায়ক ই এ ক্লার্কের সঙ্গে টস করতে নামেন নর্থ জোন ( উত্তরাঞ্চল) অধিনায়ক রকিবুল হাসান।

টস জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন রকিবুল। নর্থ জোনের প্রথম ইনিংস শেষ হয় ১১৯ রানে। বিশোর্ধ্ব ইনিংস খেলেন ওমর খালেদ রুমি (২৭) ও এ এস এম ফারুক (২৩)। জবাবে ১২৩/১ নিয়ে ইনিংস ঘোষণা করেন সফরকারী অধিনায়ক। দ্বিতীয় ইনিংসটিকে নিজের রঙে রঙিন করে তোলেন স্বাগতিক অধিনায়ক রকিবুল হাসান। পয়লা জানুয়ারি ছিল তার জন্মদিন। ৭৩ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলে নিজের জন্মদিনটিকে রাঙিয়ে তোলেন রকিবুল। ৪০ রানে অপরাজিত থাকেন ফারুক। ১৮৫/৭ নিয়ে ইনিংস ঘোষণা করেন রকিবুল। দিনের শেষ বিকালে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ৩৯ রান তুলতেই ৪ উইকেট হারিয়ে বসে এমসিসি। সময় স্বল্পতায় উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচটি শেষ হয় অমীমাংসিতভাবেই।

দ্বিতীয় ম্যাচের ভেন্যু ছিল বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। দুই দিনের এ ম্যাচে এমসিসির কাছে ইনিংস ব্যবধানে হেরে যায় শামীম কবিরের নেতৃত্বাধীন পূর্বাঞ্চল। সৈয়দ আশরাফুল হকের ৬০ রানে ভর দিয়ে প্রথম ইনিংসে ১৬২ রান সংগ্রহ করে স্বাগতিকরা। জবাবে ২৬৭/৬ নিয়ে ইনিংস ঘোষণা করে সফরকারীরা। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে স্বাগতিকরা। ইনিংস শেষ হয় মাত্র ৭৪ রানে। সর্ব্বোচ্চ ২৯ রান আসে অধিনায়ক শামীম কবিরের ব্যাট থেকে।

তৃতীয় ম্যাচটির ভেন্যু ঢাকা (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু) স্টেডিয়াম। এটিই ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল নামে প্রথম ম্যাচ। তিন দিনের ম্যাচটিকে ‘আন অফিসিয়াল টেস্ট ম্যাচ’ হিসাবে লেখা হয়েছিল ওই সময়ের পত্র-পত্রিকায়। ম্যাচটি উপভোগ করতে ৪০ হাজার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ঢাকা স্টেডিয়াম ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। ম্যাচে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেন শামিম কবির। টস জিতে আগে ব্যাট করতে নেমে ৯ উইকেট হারিয়ে ২৬৬ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। ইউসুফ রহমান বাবুর ব্যাট থেকে আসে মূল্যবান ৭৮ রান। এছাড়াও ব্যাট হাতে নৈপুণ্য দেখান ফারুক (৩৫) শামিম কবির (৩০) ও রুমি (২৮)। জবাবে ৩৪৭ রানে অলআউট হয় এমসিসি। দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেট হারিয়ে ১৫২ রান জমা করে বাংলাদেশ। সময় স্বল্পতায় ড্র হয় ম্যাচটি।

এ সফরে এমসিসি শেষ ম্যাচটি খেলে সাউথ ( দক্ষিণাঞ্চল) জোনের বিপক্ষে। যশোরে অনুষ্ঠিত দুদিনের ওই ম্যাচটির ফলও ড্র। তিন ড্র ও এক জয় নিয়ে ১৫ দিনের সফর শেষ করে এমসিসি। এরপর আইসিসির পরের মিটিংয়েই কাঙিক্ষত ফল পায় বাংলাদেশ। ১৯৭৭ সালের ২৬ জুলাই আইসিসি সহযোগী পদ লাভ করে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে আইসিসি চ্যাম্পিয়নশীপ খেলার সুযোগ মেলে। প্রথমবার বাংলাদেশ আইসিসি ট্রফিতে অংশ নেয় ১৯৭৯ সালে। এরপর এই আসরের ষষ্ঠ মিশনে এসে বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করে টাইগাররা।

এমসিসির সফরের সময় আনা হয় বাংলাদেশ ক্রিকেটের শুভাকাঙ্ক্ষী মারলারকে, যিনি প্রথম বিদেশি পত্রিকায় বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে লিখেন। ছবিটি নেওয়া হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ’ বই থেকে, লেখক- হাসান বাবলী।
এমসিসির বাংলাদেশ সফর ও আইসিসির সহযোগী সদস্য পদ লাভের সঙ্গে একজন মানুষের অবদানের কথা উল্লেথ না করলেই নয়। ব্যক্তিটি হলেন হলেন ইংলিশ ক্রিকেটার ও সাংবাদিক রবিন মারলার। ১৯৭৬ ইংল্যান্ডের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘সানডে টাইমস’-এ বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে, ‘উইদার বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটা প্রতিবেদন লেখেন। এটাই বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে কোন বিদেশির প্রথম লেখা। বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে তার এই আগ্রহ নজর কাড়ে ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের। এমসিসির সফর ও বাংলাদেশের আইসিসির সদস্য পদ পাওয়াটাও সহজ হয় বাংলাদেশের জন্য।

অথচ এ দেশের অনেকে সহজ পথটা করে তুলতে চেয়েছিল মহাকঠিন! দেশ স্বাধীন হওযার পর বাংলাদেশ ত্রিকেটের অস্তিত্ব সংকটে পড়ার সময়টা নিয়ে রকিবুল হাসান বলেন, “আমি বলব স্বাধীন দেশে ক্রিকেট নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল। আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে এটা করা হয়েছিল। যাদের সঙ্গে ক্রিকেটের কোন সম্পর্কই ছিল না কখনো। বাংলাদেশে ক্রিকেট বন্ধ করার আগে ওরা ভুলে গিয়েছিল শহীদ ক্রিকেটার জুয়েল, সংগঠক মুশতাকের কথা। ১৯৭১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারির কথা। ওই দিন পাকিস্তানের হয়ে কমনওয়েলথ একাদশের বিপক্ষে আনঅফিসিয়িাল টেস্ট ম্যাচে ব্যাটে ‘জয় বাংলা’ স্টিকার লাগিয়ে ব্যাট করতে নেমেছিলাম।” যোগ করেন, “পাকিস্তানিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমরা ক্রিকেট খেলেছি। ওদের বৈষম্যমুলক আচরণের কারণে আমরা জাতীয় দলে সুযোগ পেতাম না। ক্রিকেট আমাদের ঐতিহ্য। আর ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষা করাটা দায়িত্ব।”

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ঐতিহ্য প্রসঙ্গে মোজাফফর হোসেন পল্টু এক ব্যাতিক্রমী গল্পও শোনালেন, “১৯৫৮ সালের দিকে। এর আগে আমরা শান্তিনগরে মহল্লার ছেলেরা ক্রিকেট খেলি। একদিন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন আমাদেরকে ডাকলেন। বললেন, শুধু মহল্লার মধ্যে খেলো কেন? লিগ খেলতে পার না। আমরা বললাম, আমাদেরকে কে সুযোগ করে দেবে। শিল্পাচার্য বললেন, আমি তোমাদের লিগে খেলার ব্যবস্থা করে দেব। সত্যিই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে লিগে খেলার ব্যবস্থা করে দিলেন। আমরা দ্বিতীয় বিভাগে অংশ নিলাম। পরের বছরই চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথম বিভাগে খেলার সুযোগ করে নিলাম।”

শান্তিনগর ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন শিল্পাচার্য। আর মোজাফফর ছিলেন সেক্রেটারি। সেসব স্মৃতি আওড়ে বললেন, “লাহোর, করাচি গেলে উনি (শিল্পাচার্য) ক্লাবের ছেলেদের জন্য ব্যাট-প্যাড-গ্লাভস এনে দিতেন। লাঞ্চ টাইমে উনার কালো গাড়ি দেখলেই ছেলেরা ভীষণ খুশী হয়ে উঠত। কেননা কালো গাড়ি মানেই লাঞ্চ পাওয়া যাবে। শিল্পাচার্য একটা কালো গাড়িতে চড়তেন।”

ক্রিকেটের সঙ্গে বাঙালির এ গভীরতা, নিবিড়তা, আত্মীক সম্পর্ক কোন মাপকাঠি দিয়েই বোধকরি পরিমাপ করা যায় না। এ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে প্রজন্ম পরম্পরায় ভালবাসার মধ্য দিয়ে। আর এই ভালবাসার জোরেই ধাপে ধাপে এগিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট। সময়ের বুননে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ ক্রিকেটের যে সৌধ, তাকে শুধু বর্তমানের ফ্রেমে বন্দী করতে চাওয়াটা, একটা বিপজ্জনক প্রবণতাই বটে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা

Archives

error: Content is protected !!